
রংপুর নগরের কামাল কাছনা এলাকায় সপরিবারে চারজন হত্যার ঘটনায় নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী মনে করছেন, মাত্র দুইজনের পক্ষে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয়। এর পেছনে আরও বড় কোনো শক্তি জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার দুপুরে কামাল কাছনার মাছুয়াপাড়ায় নিহতদের বাড়িতে আয়োজিত শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে গোপীনাথ চক্রবর্তী এ কথা বলেন। তিনি জানান, পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনা সম্পর্কে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
গোপীনাথ বলেন, একজন মানুষকে হত্যা করাই কঠিন কাজ। সেখানে দুই ব্যক্তি কীভাবে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করে স্বাভাবিকভাবে সেখানে অবস্থান করতে পারে, তা নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে। তবে কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা সন্দেহের কথা জানাননি তিনি।
হত্যাকাণ্ডের মামলাটি বর্তমানে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তদন্ত করছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার সময় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা, ঘটনাস্থলে অভিযুক্তদের অবস্থান এবং হত্যাকাণ্ডের পরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডসহ নানা বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও প্রীয়ম চক্রবর্তী।
এদিকে নিহত গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীকে স্মরণ করে রংপুর জিলা স্কুলে প্রার্থনা ও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও গ্রহণযোগ্য একজন শিক্ষক। তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে শোকাহত। দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে নিহতের গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের শিব দেউলপাড়ায়ও নেমে এসেছে নীরবতা। স্বজনরা জানিয়েছেন, গণপতি চক্রবর্তী প্রায় ১০ বছর আগে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। তাঁর পারিবারিক বিষয় নিয়ে তিনি তাদের সঙ্গে তেমন কোনো কথা বলতেন না।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই তরুণ মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে ঘিরেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দুই তরুণের পক্ষে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করার বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গ্রেপ্তার দুজন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে হত্যার পর ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা এবং বাড়ি থেকে টাকা ও স্বর্ণালংকার নেওয়ার কথা উঠে এসেছে বলে জানা গেছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধক রেখে ইয়াবা নিয়েছিলেন। পরে হত্যাকাণ্ডের পর টাকা পরিশোধের বিষয়টিও তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। স্থানীয় একটি দোকানে বড় অঙ্কের নোট ভাঙানোর ঘটনাও তদন্তের আওতায় এসেছে।
এদিকে নিহত মা ও মেয়ের ধর্ষণের শিকার হওয়ার বিষয়ে এক ডোমের বক্তব্য সামনে আসায় নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে এবং শরীরে ধস্তাধস্তির সামান্য চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধর্ষণের বিষয়ে তিনি নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
ঘটনার সময় বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়েও তথ্যের গরমিল পাওয়া গেছে। তদন্তকারী দলের দাবি, অপরাধের পর বাড়ি অন্ধকার রাখতে মিটার থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তবে এক ইলেকট্রিশিয়ান জানিয়েছেন, লাইনে ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ ছিল না এবং পরে তিনিই সংযোগ ঠিক করেন।
গ্রেপ্তার দুই তরুণের পরিবারের সদস্যরাও তাদের সন্তানদের নিয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন। সিদ্ধার্থের বাবা বিনোদ চন্দ্র দাস বলেন, তাঁর ছেলে মাদকাসক্ত হলেও এমন অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। অন্যদিকে মুগ্ধর মা জানিয়েছেন, ছেলে কিছুদিন ধরে মাদক সেবন করলেও হত্যার মতো অপরাধে তার জড়িত থাকার বিষয়টি তিনি মানতে পারছেন না।
সব মিলিয়ে রংপুরের এ চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উঠে আসা বিভিন্ন অসঙ্গতি ও প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।